সোমবার, ৭ আগস্ট, ২০১৭

              আরণ্যক : চরিত্রের দর্পণে
                   
                          -মনোজিৎ দাস





  •      বিভূতিভূষণ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন--- কখনো কর্মসূত্রে বা কখনো নিছক ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। কর্মজীবনে শিক্ষকতার চাকুরি নিয়ে থেকেছেন হুগলির জাঙ্গি পাড়ায়, সোনারপুরে বা কখনো খেলাতচন্দ্র  ঘোষ এস্টেটের  ‘খেলাত চন্দ্র ক্যালকাটা ইনস্টিটিউশনে’। তাঁর এই শিক্ষক জীবনের অভিজ্ঞতা যেমন বর্ণিত হয়েছে ‘অনুবর্তন’ (১৯৪২) উপন্যাসে, তেমনি ‘আরণ্যক’ (১৯৩৯) উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে লবটুলিয়া, ফুলকিয়া বইহার মহালিখারূপ পাহাড়ের পাদদেশের বিস্তীর্ণ অরণ্যাঞ্চলের অভিজ্ঞতা। নিছক কোন কাহিনি নয়, ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে বিস্তৃত প্রকৃতির পটে তার স্নেহ-ছায়ায় লালিত মানুষের কথা – তাদের জীবন, জীবিকা, তাদের ওপর মহাজন শ্রেণীর অত্যাচার, সুখ-দুঃখ, সংস্কার, আনন্দ-বিনোদন সবকিছুই।

  •     বিভূতিভূষণের উপন্যাসগুলির মধ্যে সর্বাধিক চরিত্রের ভীড় আমরা লক্ষ করি ‘আরণ্যক’-এ।  তিনি উপন্যাসের প্রস্তাবনা অংশে পাঠকদের জানিয়েছেন– ‘‘ শুধু বনপ্রান্তর নয়, কত ধরনের মানুষ দেখিয়াছিলাম।’’ বিভূতিভূষণ এই মানুষগুলি দেখেছেন সত্যচরণের দৃষ্টিতে– যা তাঁরই আর এক সত্তা। এই মানুষগুলি নিতান্তই সহজ সরল। বিশাল অরণ্যের পটভূমিকায়, তার সুগভীর আলোছায়ায় তাদের জীবন-জীবিকা নিস্তব্ধ গতিতে প্রবাহিত। শহরের মানুষ এদের খোঁজ রাখে না। সত্যচরণও এদের কাছে এসেছে নিতান্তই দায়ে পড়ে – জীবিকার প্রয়োজনে ,ইসমাইলপুর মহালে ম্যানেজারী করতে গিয়ে। তবে সত্যচরণ এদের ভালোবেসে কাছে টেনে নিয়েছিল পরম আত্মীয়তায়। পাটোয়ারী বনোয়ারীলাল, স্কুল মাস্টার গনোরী তেওয়ারী, গনু মহাতো, বিশুয়া সরল মহাজন ধাওতাল সাহু, কুন্তা, ব্রহ্মা মাহাতো, গিরিধারীলাল, নৃত্যশিল্পী ধাতুরিয়া, রাজু পাঁড়ে, রাখাল বাবুর স্ত্রী, যুগলপ্রসাদ, মটুকনাথ, বৃদ্ধ নকছেদি ভকত, ননীচোরা নাটুয়া, রাজা দোবরু পান্না, জগরু পান্না, ভানুমতী, বিহার প্রবাসী বাঙালি পরিবারের কন্যা ধ্রুবা, জবা, কবি বেঙ্কটেশ্বর প্রসাদ– এদের কথামালাই হল ‘আরণ্যক’ উপন্যাস। এছাড়া প্রকৃতিও এখানে একটি স্বতন্ত্র চরিত্র হয়ে উঠেছে বিভূতিভূষণের লেখনির গুণে। ফুলকিয়া বইহারের জ্যোৎস্না রাত্রি, অরণ্যের নানা গাছপালা ফুল,পাখি, বন্য জন্তু, পাহাড়, ঝর্ণা, নদী নিয়ে নানা ঋতুতে তার পরিবর্তন– সব মিলিয়ে অরণ্যের প্রকৃতি এক চলমান সত্তার বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়। তবে এই শান্ত-স্নিগ্ধ,সুন্দর, সরল আদিমতার মধ্যেও কখনো কখনো রাসবিহারী সিং রাজপুত, নন্দলাল ওঝা গোলাওয়ালার মতো কিছু দাপুটে মহাজন শ্রেণী উপস্থিত থেকে প্রকৃতিকে করে তুলেছে অশান্ত – হিংস্রতায়, অত্যাচারে, প্রজাপীড়নে।  

  •         উপন্যাসের কেন্দ্রীয় এবং প্রধান চরিত্র সত্যচরণ। বন্ধুর পিতার ত্রিশ হাজার বিঘা জমিতে প্রজা বসানোর দায়িত্ব নিয়ে সত্যচরণ যায় বিহারের ইসমাইলপুর মহালে। সে কলকাতার শিক্ষিত যুবক। লাইব্রেরি, থিয়েটার, সিনেমা, গান, বন্ধুদের সঙ্গে কাটাতে অভ্যস্থ সত্যচরণ সেখানে গিয়ে দেখল, দুটো ভালো কথা বলার লোক নেই। এহেন পরিস্থিতিতে তার মনে হয়েছে–‘‘চাকুরীতে দরকার নাই, এখানে হাঁপাইয়া মরার চেয়ে আধপেটা খাইয়া কলিকাতায় থাকা ভালো।’’ এখানকার বন্য বর্বর মুর্খ মানুষ, যারা একটা কথা বললে বুঝতে পারে না, তাদের সঙ্গে সত্যচরণকে দিনের পর দিন কাটাতে হবে ভেবে আঁতকে উঠেছে। কিন্তু যত দিন গেছে, এখানকার অরণ্য প্রকৃতিকে, তার স্নেহ ছায়ায় বেড়ে ওঠা মানুষগুলিকে পরম আত্মীয়তায় কাছে টেনে নিয়েছে সত্যচরণ। ছয় বছরের ম্যানেজারী জীবনে সে তিলে তিলে অরণ্যের শান্ত-সৌম্য মূর্তিকে ক্ষয় করেছে। নষ্ট করেছে তার কুমারী সৌন্দর্য়, কিন্তু জীবনে কিছু মহৎ কাজও করেছে বটে। সত্যচরণ ক্ষুর্ধাতকে নিমন্ত্রণ করে ভাত খাইয়েছে। ভবঘুরেকে দিয়েছে স্থায়ী বাসস্থান, আত্মীয়হীনাকে দিয়েছে স্বজন জনিত ভালোবাসা, চীরদুঃখিনীকে বিনা সেলামিতে জমি দান করে সারা জীবনের অন্নের সংস্থান করেছে নিশ্চিত। তবে সত্যচরণ এসব করতে গিয়ে ম্যানেজারীর কাজে বিন্দুমাত্র অবহেলা করেনি। প্রয়োজনে তাঁকে একটানা ছয় সাত ঘন্টা ঘোড়ার ওপর থাকতে হয়েছে, মাসের পর মাস কাটাতে হয়েছে বনের ধারে খুপরি তৈরী করে। দায়িত্ব সে পালন করেছে নিষ্ঠার সঙ্গেই– শুধু পথে চলতে গিয়ে সত্যর ঘোড়া থেমেছে তার ওপর এইসব মানুষদের আন্তরিক  শ্রদ্ধায়, কখনো নির্মল হাস্যের সহিত আত্মীয়তায়।

  •        আজমাবাদ কাছারিতে বা লাবটুলিয়ার ডিহি কাছারিতে থাকার সময় সত্যচরণ কাছারির কর্মচারীদের হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছে কিন্তু কখনোই তার মধ্যে ম্যানেজারের দাঢ্য প্রকাশ পায়নি। তাদের সুবিধা-অসুবিধাকে, দাবীকে মান্যতা দিয়ে যথাসাধ্য তা পূরণ করার চেষ্টা করেছে। তাই দেখা যায় সিপাহী মুনেশ্বর সিংহের একটি কড়াইয়ের আবদার পূরণ করেছে সত্যচরণ। প্রজার স্বার্থ ও কাছারির কর্মচরীর স্বার্থ যাতে কোনোমতেই ক্ষুন্ন না হয়, সেদিকেও ছিল সত্যচরণের সজাগ দৃষ্টি। মহাজন নন্দলাল ওঝা গোলাওয়ালা তার বড় ছেলের চাকুরির উমেদার হয়ে সত্যচরণকে নগদ বারোশো টাকা পান খাওয়ায় জন্য দিতে চাইলেও সে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। সে স্পষ্ট ভাবে জানিয়েছে– ‘‘আমি বহাল করার মালিক নই। যাদের জমিদারী তাদের কাছে দরখাস্ত করতে পারো। তাছাড়া বর্তমানে যে রয়েছে –– তাকে ছাড়ব কোন অপরাধে ?’’ আবার রাসবিহারী সিং রাজপুত ও নন্দলাল ওঝা গোলাওয়ালার নেতৃত্বে ভীমদাস টোলার উত্তর সীমানায় ভয়ানক দাঙ্গা বাধলে সত্যচরণ তৎক্ষনাত তা দমন করেছে। এই শিক্ষা বশত সত্যচরণ পরবর্তী কালে এই এলাকায় গাঙ্গোতা ছাড়া অন্য কাউকে জমি বিলি করেনি।

  •        অরণ্যবাসের পনের-ষোল বছর পর স্মৃতির সারণী বেয়ে সত্যচরণ রোমান্থন করেছে তার পূর্ব অভিজ্ঞতার কথা–– সমস্ত দিন অফিসের হাড় ভাঙা খাটুনির পর গড়ের মাঠের কোর্টের কাছে বাদাম গাছের তলায় বসে। প্রজা বসানোর কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে বিস্তীর্ণ অরণ্য প্রকৃতি একদিন সত্যচরণের হাতে বিনষ্ট হয়েছিল। এই অপরাধবোধ লাঘব করার জন্য সত্যচরণ উপন্যাসের কাহিনীর অবতারণা করেছে–– উপন্যাসের প্রস্তাবনা অংশ থেকে আমরা তা জানতে পারি। এই কাহিনীতে প্রকৃতিরই প্রাধান্য, তবে প্রকৃতির কথা বলতে গিয়ে প্রসঙ্গক্রমে এসেছে মানুষের কথা–– যারা সংখ্যায় নিতান্তই কম নয়। সত্যচরণ যে ভাবে এই মানুষ গুলিকে দেখেছে, উপন্যাসে তাদের তুলে ধরেছে। অধ্যাপক ক্ষেত্র গুপ্ত এই চরিত্র গুলি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন–– ‘‘এদের লেখকের সৃষ্টি বলে মনে হয় না, তিনি যেন বিশ্বস্রষ্টার ভান্ডার থেকে এদের সংগ্রহ করে এনেছেন।  ... ... সকলেই দ্বিমাত্রিক, কোনো চরিত্র নিজ পরিচয়ের প্রত্যক্ষতা ছাপিয়ে ওঠে না, তাদের জন্য নির্ধারিত সরল লাইন থেকে বেঁকে যায় না |"

  •          প্রকৃতি যেখানে মুখ্য, আর সব গৌণ, লেখক অন্যসব ক্ষেত্রে একটা সীমারেখা টানবেন ––এটাই স্বভাবিক। তাই মানুষ যারা আছে সকলেই একই গঁতে বাধা, তবে যেখানে মানুষ আছে অথচ ভালো মন্দর মিশ্রণ থাকবে না তা-ই বা হয় কি করে ? তাই নন্দলাল ওঝা গোলাওয়ালা, রাসবিহারী সিং রাজপুত বা ছটু সিং রাজপুতদের মতো দুঃবৃত্ত চরিত্রও সৃষ্টি করতে হয়েছে লেখককে। আবার সমগ্র উপন্যাস জুড়েও এদের অবস্থিতি আমরা লক্ষ্য করি না, কারণ একটাই প্রকৃতির সর্বাধিক প্রাধান্য।

  •        উপন্যাসটিতে যে সব চরিত্রের সাক্ষাত আমরা পাই, তাদের মধ্যে গনোরী তিওয়ারী, ভবঘুরে প্রকৃতির লোক। কোনো দিনই সে একজায়গায় থিতু হতে পারে নি। সে স্থান থেকে স্থানান্তরে ঘুরে পাঠশালা করেছে–– কখনও পর্ব্বতা গ্রামে আবার কখনও মুঙ্গেরের পাড়া গাঁয়ে। কিন্তু কোথাও দু তিন মাসের বেশি পাঠশালা চালাতে পারেনি। দরিদ্র এই ব্রাহ্মণ যুবকের কাছে ভাত জিনিসটা স্বপ্নের মতো। স্থানীয় মহিষ বাথান গুলিতে খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে একদিন গাঙ্গোতাদের সঙ্গে সে লবটুলিয়ার কাছারিতে যায় ম্যানেজার বাবুর কাছ থেকে দুটি ভাত খাবার আশায়। সত্যচরণের কথায়–– ‘‘গনোরীর মতো এত দরিদ্র লোক এ অঞ্চলে বেশি দেখা যায় না।’’

  •          উপন্যাসে গনোরীর মতো আরেকজন শিক্ষকের সাক্ষাৎ আমরা পাই –– নাম মটুকনাথ পাঁড়ে। বয়স ষাটের ওপর হলেও তার ইচ্ছা শক্তির এতটুকুও অভাব নেই। পথে তিন দিন হেঁটে সে সত্যচরণের কাছে যায় রোজগারের আশায় লবটুলিয়ার জঙ্গলে। চাষের কাজ জানে না সে। যেহেতু তারা বংশানুক্রমে শাস্ত্রব্যবসায়ী পন্ডিত, তাই সে অত্যন্ত নিষ্ঠা সহকারে কাছারিতে টোল প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু নির্জন অরণ্যে ছাত্রের বড়ই অভাব থাকায় শূন্য ঘরে সে একাই উৎসাহ এবং ধৈর্য সহকারে সকাল বিকাল উচ্চস্বরে পড়াশোনা করে। এই ভাবে দিন যায়, মাস আসে। দুমাস পরে সে টোলে একজন ছাত্র পায়। কালক্রমে আরোও ছাত্র হয়। নিজে না খেয়ে ছাত্রদের একবেলা আধপেট খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখে তার টোলের অস্তিত্ব। পরবর্তীতে একজন মান্যগণ্য শিক্ষকে পরিণত হয় সে। সকলেই তাকে খাতির ও সমীহ করে চলে। ছাত্রদের বাড়ি থেকে সে এত গম আর মকাই পায় যে তা রাখার জন্য তাকে টোলের উঠোনে গোলা তৈরি করতে হয়। মটুকনাথ ছাত্র পেল, সম্মান পেল, প্রচুর আয়ও সে করতে লাগল –– এসব নিছক কপাল গুণে নয়,  এই প্রাপ্তির মূলে তার কর্মের প্রতি আসক্তি ও ধৈর্য, এবং অধ্যবসায় কাজ করেছে। অথচ যুবক গনোরী তেওয়ারী কোন কিছুই পায়নি –– সম্মান, অর্থ, সংসার কিছুই না। বারো বছর বয়সে সেই যে পিতাকে হারাল, তারপর থেকেই তার ভাগ্যের অন্বেষণ  শুরু হল যা এখনও অব্যাহত। অবশ্য সত্যচরণ তাকে আশ্বাস না দিলেও মনে মনে ভেবেছে–– ‘‘এখানে একটা পাঠশালা করিয়া দিয়া গনোরীকে রাখিয়া দিব।’’

  •       আজমাবাদ, লবটুলিয়া, ফুলকিয়া বইহারের অরণ্য প্রকৃতির ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থেকে যারা আজীবন কাটিয়েছে তাদের মধ্যে যুগল প্রসাদ ও গনু মাহাতো অন্যতম। একজন উদ্ভিদ বিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে অরণ্যকে দেখেছে অত্যন্ত কাছ থেকে, আরেকজন গভীর অরণ্যের অবস্থার নানা তথ্য সংগ্রহ করে ঝুলিকে করেছে পরিপূর্ণ। আজমাবাদ কাছারির পাটোয়ারী বনোয়ারীলালের চাচাতো ভাই যুগল প্রসাদ। কায়েথি হিন্দিতে রীতিমত ওস্তাদ। উদাসীন প্রকৃতির লোক যুগল, সংসারে তার মন নেই অথচ সন্ন্যাসী গোছের ব্যক্তিও নয়–– অবৈষয়িক, খামখেয়ালি। প্রকৃতি প্রেমিক, সুন্দরের পুজারি যুগল প্রসাদ বনের সৌন্দর্যায়নের জন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা রকম গাছ–– দেশি বিদেশী ফুলের লতা এনে লাগায়, যেখানে যা নেই। সত্যচরণ তাকে আবিষ্কার করে সরস্বতী কুন্ডীর তীরে বনের মধ্যে। সত্যচরণ ফুলকিয়া লবটুলিয়া বইহার, সরস্বতী কুন্ডীর তীরের বনে যে বুনো ফুলের সৌন্দর্য দেখে রাত বেরাতে মুগ্ধ হয়েছে, তা যুগল প্রসাদের জন্যই। যুগল প্রসাদ সত্যচরণকে জানায় –– ‘‘এখন আমি ও কাজে ঘুণ হয়ে গেছি।’’ কিন্তু তার এই ভালোবাসাকে লোকে পাগলামো-ই ভাবত। ছেলেবেলায় যখন কুশী নদীর ধারে মহিষ চড়িয়ে বেড়াত তখন থেকে আজ পর্যন্ত অত্যন্ত উদ্যম ও অক্লান্ত পরিশ্রম সহকারে কাজ করে চলেছে যুগল প্রসাদ। সত্যচরণও তার কাজে মুগ্ধ হয়ে বনের সৌন্দর্যায়নের কাজে উদ্যোগী হয়। দুজনে মিলে বিভিন্ন জায়গায় লাগায় হোয়াইট বিম, রেড ক্যাম্পিয়ন, স্টিচওয়ার্ট প্রভৃতি লতা ফুলের বীজ। পূর্ণিয়া, জয়ন্তী পাহাড়, ডুয়ার্স, ধরমপুর, কলকাতা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে কষ্ট করে এনে পোঁতা এইসব ফুলের সৌন্দর্য অচিরেই নষ্ট হয়, যেদিন সত্যচরণকে প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি ছটু সিং সহ অন্যান্য প্রজাদের বিলি করে দিতে হল।

  •        গনু মহাতো গাঙ্গোতা প্রজা। বয়স ষাটের উপর হলেও লবটুলিয়ার জঙ্গলে সে খুপরি বানিয়ে থাকে। দু-বিঘা জমিও পাঁচটি মহিষ তার সম্পত্তি। বাঘের ভয়কে উপেক্ষা করে, নিজের খেতের খেড়ীর দানা সেদ্ধ, নুন সহযোগে বাথুয়া শাক সেদ্ধ এবং ফাল্গুন মাসে জঙ্গল থেকে প্রাপ্ত গুড়মী ফল  খেয়ে সে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে কাটায়। ভাত সে খেতে পায় না। শুধু গনুই নয়, গাঙ্গোতা প্রজাদের কাছে ভাত খাওয়া একটা অলীক স্বপ্নের মতো | সরল মুখশ্রীর শান্ত চোখের দৃষ্টির গনুকে সত্যচরণের খুব ভালো লেগেছিল। এই গনুর ছিল আশ্চর্য গল্প বলার ক্ষমতা। সত্যচরণ তার কাছেই প্রথম শুনেছিল, বুনো মহিষের দেবতা টাঁড়বারোর কথা। এছাড়া শীতের সন্ধ্যায় আগুন পোহাতে পোহাতে সত্যচরণকে সে শুনিয়েছে নানা রহস্যময় গল্প –– উড়ুক্কু  সাপের কথা, জীবন্ত পাথরের গল্প প্রভৃতি।

  •        রাজু পাঁড়ে ভক্ত, প্রকৃতি প্রেমী, কিছুটা অন্তর্মুখী এবং কবি স্বভাবের। সবকিছুতেই তার নিস্পৃহ ভাব। সে সাত্ত্বিক প্রকৃতির লোক। সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত সে পূজা-অর্চনা করে, বই পড়ে, আকাশ ও গাছপালা দেখে সময় কাটায়। সত্যচরণ নামমাত্র সেলামিতে দুবিঘা জমি রাজুকে দেয়। কিন্তু তাও সে সম্পূর্ণ চষে উঠতে পারে না। ফসল যা ফলায় তাও সামান্য  চীনা ঘাসের দানা। তার সম্বল বলতে একটা বড় লোটা। বিত্তের প্রতি লোভ তার নেই। তার মতে –– ‘‘টাকার লোভ, পাওনা-দেনার কাজ যেখানে চলে, সেখানকার বাতাস বিষিয়ে ওঠে।’’ অনেক গুলি গুণের সমন্বয় আমরা রাজুর মধ্যে লক্ষ করি। এলাকায় সে বিশিষ্ট চিকিৎসকও বটে ! শুয়োরমারি বস্তিতে প্রবল এশিয়াটিক কলেরার প্রকোপ দেখা দিলে সে নিঃস্বার্থে চিকিৎসা করে। তার ওষুধে গিরিধারীলাল সুস্থ হয়ে ওঠে। রাজুর এই চারিত্রিক গুণাবলী সত্যচরণের খুব ভালো লেগেছিল বলেই সত্যচরণ তাকে চকমকি টোলায় দোবরু পান্নার বাড়িতে ঝুলনের উৎসবে নিয়ে গিয়েছিল, আর নিয়ে গিয়েছিল ছট-পরবের সময় বিভিন্ন টোলায় নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। এছাড়া সত্যচরণও রাজুর ডাকে সাড়া দিয়ে রাত বেরাতে ছুটে গেছে তার খুপরিতে –– কখনো চায়ের পার্টিতে, কখনো নিছক গল্প করতে, আবার কখনো বুনো শুয়োর তাড়াতে। রাজুর খুপরির সামনে আসান গাছের তলায় বসে বুনো ফুলের মৃদু সুবাস নিতে নিতে সত্যচরণ রাজুর প্রেমিক জীবনের কথা শুনে মুগ্ধ হয়েছে। কখনো আবার উইয়ের ঢিপি থেকে রামধনু ওঠার কথা শুনে হাস্য সংবরণ করেছে। এই ধরণের আরোও কত গল্প রাজু করেছে যার মধ্যে মৌলিক চিন্তার পরিচয় পাওয়া যায়, যেমন–– নক্ষত্ররা যমের চর, সূর্য উদয় পাহাড়ে ওঠে আর পশ্চিম সমুদ্রে অস্ত যায় প্রভৃতি। গল্পপ্রিয় রাজু বিত্তের প্রতি নিস্পৃহ থাকা সত্ত্বেও জীবনে সে উন্নতি করেছে অনেক। ছটি থেকে এখন তার দশটি মহিষ হয়েছে। পয়সার মায়া বুঝলে সে যে রাসবিহারী সিং এর মতো  ধনী হতে পারত না তাতে সন্দেহ কোথায় ?  বিত্তে নিস্পৃহতা ও বৃহৎ ক্ষতিকে তাচ্ছিল্য করিবার ক্ষমতা’’ সত্যচরণ যার মধ্যে দেখেছিল, সে ধাওতাল সাহু। নিরীহ এবং সৎ প্রকৃতির লোক ধাওতাল। সকলকেই বিশ্বাস করে সে টাকা ধার দেয়, কিন্তু আদায় করতে পারে না। তবুও এক অগাধ বিশ্বাসে সে বলে –– ‘‘ব্যবসা করতে গেলে লাভ লোকসান আছেই হুজুর’।

  •      ‘‘রাজা লিজিয়ে সেলাম ম্যায় পরদেশিঁয়া’’–– গানটি গেয়ে যে ছেলেটি সত্যচরণের মন জয় করে নিয়েছিল, সে ধাতুরিয়া। শান্ত ও নম্র প্রকৃতির এই ছেলেটি প্রকৃতই শিল্পী। বিভিন্ন জায়গায় সে বায়না নিয়ে নাচ দেখায়। বায়না না থাকলে সে জমিতেও কাজ করে। একান্ত মানসিক ইচ্ছা এবং অধ্যবসায়ের জোরে সে গয়া জেলার ভিটল দাসের কাছ থেকে ছক্করবাজি নাচ শেখে। এছাড়া নিজের চর্চা ও চেষ্টায় নাচের মুদ্রাও সে তৈরি করে। আধুনিক শিক্ষা সংস্কৃতির পিঠস্থান কলকাতা। ধাতুরিয়ার একান্ত ইচ্ছে সে কলকাতা গিয়ে ছক্করবাজি নাচ দেখাবে, কারণ সেখানকার লোক নাচ গানের কদর বোঝে। শিল্পীর, যথার্থ গুনীর আদর দিতে তারা অবহেলা করে না। অন্যদিকে ননীচোরা নাটুয়ার বালক শ্রীকৃষ্ণ সেজে নাচার বয়স না থাকলেও পেটের দায়ে নলখাগড়ার বাঁশিতে কাজ চালিয়ে হেলে দুলে মেলাতে নাচ দেখিয়ে বেড়ায়। এতেও তার আয় মাত্র তের আনা পয়সার বেশি হয় না।

  •         দীর্ঘ ম্যানেজারী জীবনে সত্যচরণের মনে যাদের কথা আঁকা আছে এবং চিরকাল থাকবে, সেই অল্প কয়েকজনের মধ্যে তিনটাঙা গ্রামের গিরিধারীলাল অন্যতম। বিনম্র স্বভাবের এই বৃদ্ধ নিতান্তই দীন। সত্যচরণ একে প্রথম দেখে মৈষন্ডির  মেলায়। ব্রহ্মা মাহাতোর কর্মচারী গিরিধারী দৈনিক খাবার আর চার আনা বেতনের বিনিময়ে মেলার আদায়কারী কর্মচারী রূপে নিযুক্ত হয়। সত্যচরণ তাকে পাঁচ বিঘা জমি দিয়েছিল বিনা সেলামিতে।

  •        ফুলকিয়া বইহারের ফসল কাটার মরসুমে সত্যচরণের সঙ্গে পরিচয় হয় মঞ্চীর। সহজ সরল হাস্যোজ্জ্বল, আমুদে স্বভাবের মঞ্চী বড়ই ছেলেমানুষী। সে নকছেদী ভকতের তরুণী ভার্যা। তাকে অবলম্বন করেই নকছেদী ও তার প্রথমা স্ত্রী স্থানান্তরে ফসল কেটে বেড়ায়। মঞ্চী বেশ সপ্রতিভ এবং গল্পপ্রিয়। মঞ্চী সত্যকে শোনায় তার রামছাগল পোষার গল্প। কাঁকোয়াড়া রাজের জমিদারিতে গরম জলের কুণ্ডে স্নান করতে গিয়ে পান্ডাদের হাতে মার খাওয়ার কথা , পূর্ণিয়ায় তাদের খুপরির দিকে বুনোহাতির আসার কথা প্রভৃতি। শুধু আমুদে প্রকৃতির নারীই নয় মঞ্চী–  আতিথেয়তার দিক থেকেও তার তুলনা হয় না। সে সত্যচরণকে রান্না করে খাওযায়। সত্যচরণের ভালো লাগে মঞ্চীর সরল মুখের হাসি, তার দেহাতি ‘ছিকাছিকি’ বুলির সুন্দর টান। নানা রকম সৌখিন জিনিস কেনা, মেলায় নাচ তামাশা দেখা মঞ্চীর প্রধান শখের মধ্যে পড়ে। সেবার বইহারের কাটনীর মেলায়  সে তিন মন সরিষা খরচা করেছিল তার সখের জিনিসপত্র –– কাঁকই, গন্ধ সাবান, মাথার কাঁটা, হিংলাজের মালা প্রভৃতি কেনার জন্য। সত্যচরণকে এক এক করে বের করে এসব সে দেখিয়েছেও। সত্যচরণের প্রতি এক ধরণের আকর্ষণ সে বোধ করেছিল। অন্যদিকে সত্যরও মনে ধরেছিল মঞ্চীকে। সত্যচরণ সকলের জন্যই কিছু না কিছু করেছে কিন্তু মঞ্চীর জন্য কিছু না করতে পারার আফসোস থেকে গেছে তার। বড় যত্ন সহযোগে বিভূতিভূষণ সৃষ্টি করেছেন মঞ্চী চরিত্রটিকে। ফসল কাটতে গিয়ে মঞ্চী বেপাত্তা হয়ে যায়।

  •         কাশীর বাইজীর মেয়ে কুন্তা। মহাজন দেবী  সিং রাজপুতের বিধবা পত্নী সে। ‘‘বড় ভালো ও শান্ত মেয়ে কুন্তা’’, কিন্তু বাইজীর মেয়ে বলে সকলেই তাকে দেখতে পারে না। লবটুলিয়ার বস্তিতে সে গাঙ্গোতাদের সঙ্গে ছেলেপুলে নিয়ে একাই থাকে। গম কাটা হয়ে গেলে জমিতে পড়ে থাকা গমের গুঁড়ো শীষ এবং পড়ে থাকা মকাই কুড়িয়ে ছাতু করে সে ছেলেপুলেদের খাওয়ায়, কিন্তু কখনো কারো কাছে হাত পেতে সে কিছুই চায় নি। তবে ম্যানেজারের পাতের ভাত নিয়ে যেতে তার আপত্তি নেই। সত্যচরণ তাকে বিনা সেলামিতে দশ বিঘা জমি দিয়েছে –– যা ছিল তার ম্যানেজারী জীবনের একটি সৎ কাজ।

  •        অরণ্যে আদিম উপজাতির রাজা, একদা সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা দোবরু পান্না বীরবর্দ্দী অবস্থা বৈগুণ্যে এখন গরু চরালেও রাজৈশ্বর্য তার আছে –– সকলেই তাকে রাজা বলে মানে। অতিথিপরায়ণ বিরানব্বই বছরের বৃদ্ধ রাজা সত্যচরণ এবং তার সঙ্গীদের সেবায় এতটুকুও ত্রুটি রাখে নি। বংশের ঐতিহ্য রক্ষায় নিষ্ঠাবান রাজা ধনঝরি পাহাড়ের উপর পূর্বপুরুষদের প্রতিষ্ঠিত দেবতাকে দর্শন করতে যায় প্রতি পূর্ণিমায়। সত্যচরণের অনুরোধে দোবরু ঘুরিয়ে দেখায় তার পূর্বপুরুষদের তৈরী দুর্গ-প্রাসাদ, সমাধিস্থল, রাজবংশের  কুলদেবতার থান। অরণ্যচারী প্রাচীন রাজবংশের নিরক্ষর রাজা হলেও আতিথেয়তায়, বংশ মর্যাদায় এবং আভিজাত্যের গুণে সত্যচরণের শ্রদ্ধা আদায় করেছিল দোবরুপান্না।

  •       রাজার নাতির মেয়ে ভানুমতী ষোড়শী যুবতী, নিটোল স্বাস্থ্যবতী। সত্যচরণদের অভ্যর্থনায় যাতে কোনো ত্রুটি না হয়, সেদিকে তার সজাগ দৃষ্টি। তাদের সময় মতো সে জিনিস জোগান দিয়েছে যখন যা দরকার–– গায়ে মাখার তেল, রান্নার চাল, আনাজ প্রভৃতি। সত্যর উনুন ধরাতে অসুবিধা হলে সে তার বুদ্ধির গুণে একটা পাখির শুকনো বাসা এনে দিয়ে আগুন জ্বালাতে সাহায্য করেছে। ভানুমতীর অতিথি সেবার, তার ভালোবাসার শ্রেষ্ঠ পরিচয় আমরা পাই প্রথমবার সত্যর বিদায়কালে তার জন্য এক বাটি মহিষের দুধ নিয়ে দ্বারে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে। ভানুমতী সত্যচরণকে তাদের পরিবারের বন্ধু এবং নিজেকেও তার অত্যন্ত কাছের মানুষ ভেবে কখনো আয়নার আবদার করেছে এবং মাঝে মধ্যে সত্য যেন তাদের দেখে যায় সেই আর্জিও জানিয়েছে। ভানুমতীর সারল্য এবং সত্যচরণের উপর তার নির্ভরশীলতা, তার নিঃসঙ্কোচ বন্ধুত্ব সত্যচরণের অত্যন্ত ভালো লেগেছিল। ভানুমতীর ব্যবহারে সত্যচরণ অনুভব করেছে স্নেহময়ী বোনকে–– প্রবাস জীবনে যা দুর্লভ। আবার এই রাজকন্যাকে সত্যচরণ কল্পনা করেছে মূর্তিমতী বনদেবী হিসেবে–– যার সঙ্গলাভে সে হয়েছে ধন্য। তবে এই সব কিছুকে ছাড়িয়ে ভানুমতীকে প্রেমিকা হিসেবে ভাবতেই সত্যচরণের বেশি ভালো লেগেছে এবং তাকে বলতেও শোনা গেছে–– ‘‘এখানে যদি থাকিতে পারিতাম! ভানুমতীকে বিবাহ করিতাম। এই মাটির ঘরের জ্যোৎস্না ওঠা দাওয়ায় সরলা বন্যবালা রাঁধিতে রাঁধিতে এমনি করিয়া ছেলেমানুষী গল্প করিত–– আমি বসিয়া বসিয়া শুনিতাম।’’ ––কিন্তু সত্যচরণ মিথ্যা আশ্বাসে ভানুমতীকে তার উপর দুর্বল করতে চায়নি বলেই মনের কথা মনে জিইয়ে রেখেছে। কারণ অরণ্যে স্থায়ী বাস করার তার নিশ্চয়তা কোথায় ?

  •         সত্যচরণকে কবিতা শুনিয়ে পরম আনন্দ পেয়েছে কবি বেঙ্কটেশ্বর প্রসাদ। গ্রাম্য কবির এই কবিতায় উঠে এসেছে রেলের কর্মচারীদের কথা, অতৃপ্ত বাল্যপ্রেমের কথা। কবিতা শুনিয়ে মুগ্ধ না করতে পারলেও কবিতার বোদ্ধা সত্যচরণের প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে এবং আতিথেয়তা দানে বেঙ্কটেশ্বর যে দৃষ্টান্তের পরিচয় দিয়েছে তা যথার্থ মানবিক। কবিপত্নীর সহাস্য রসিকতাও সত্যের মনে দখিনা বাতাসের হিল্লোল তুলেছিল।

  •         অরণ্যের শান্ত পরিবেশে সহজ-সরল মানুষগুলির কাছ থেকে চড়া হারে সুদ নিয়ে, জমির ফসল দখল করে মাঝে মধ্যে সুস্থ পরিবেশকে বিষাক্ত করে তোলে রাসবিহারী সিং রাজপুত, নন্দলাল ওঝা গোলাওয়ালা, ছোটু সিং প্রভৃতি চরিত্রগুলি। প্রজার ঘরে আগুন লাগানো, মহালে দাঙ্গা সৃষ্টি করা প্রভৃতি এদের নৈমিত্তিক কার্যাবলীর অঙ্গ হয়ে ওঠে। বর্বর প্রাচুর্য বলতে যা বোঝায়, তার জ্বাজ্বল্যমান চিত্র সত্যচরণ রাসবিহারী সিংহের বাড়িতে দেখতে পায়। অর্থের প্রাচুর্য থাকলেও সাধারণ গাঙ্গোতা প্রজার চাইতে এদের পারিবারিক পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর এবং শিক্ষাদীক্ষাবর্জিত।তবে স্বার্থ সিদ্ধির জন্য সত্যচরণের প্রতি আতিথেয়তায় এদের কোনো খামতি ছিল না।

  •          এছাড়া রাখাল বাবুর স্ত্রী, বিহার প্রবাসী বাঙালি পরিবারের যুবতী কন্যা ধ্রুবা, জবা, কাছারির পাটোয়ারী বনোয়ারী লাল, মৈশন্তির মেলার ইজারাদার ব্রহ্মা মাহাতো, গাঙ্গোতা কিশোর বিশুয়া, নন্দকিশোর গোঁসাই, আমিন রামচন্দ্র সিং, আমিন পূরণচাঁদ ও তার টিন্ডেল ছট্টুলাল, আমিন রঘুবর প্রসাদ, জগরু পান্না, নকছেদী ভকত, তুলসী, ছানিয়া, সুরতিয়া, জয়পাল কুমার, সাধু বাবাজী, গোঁড়গোঁড় পরিবারের প্রধান, বলভদ্র সেঙাই প্রভৃতি অসংখ্য চরিত্রের কথা আমরা উপন্যাসটিতে পাই–– যাদের মধ্যে কেউ দীনদুঃখী, কেউ উদাসীন, কেউ দরদী এবং উদার মানসিকতা সম্পন্ন, কেউ শুধু কাজ পাগল আবার কেউ জীবনে উন্নতির নেশায় মশগুল। যেমন বলভদ্র সেঙাইয়ের কথাই ধরা যাক–– পঞ্চাশ বছর বয়স পার  হলেও সে আশা রাখে উন্নতির––‘‘মহিষ আমায় একজোড়া কিনে দিও পাঁড়েজী। এবার ফসল হোক, সেই টাকা দিয়ে মহিষ কিনতেই হবে–– ও ভিন্ন উন্নতি হয় না।’’

  •         আরণ্যক উপন্যাসে বর্ণিত চরিত্ররা অনেকেই অনেক কিছু পেয়েছে জীবনে। আবার অনেক থাকা সত্ত্বেও কেউ তা হারিয়েছে বৈষয়িক বুদ্ধির অভাবে বা  উদাসীন মানসিকতার কারণে। অনেক ভূমিহীনরা ভূমি পেয়ে স্থায়ী বসবাসের এবং খাদ্যের সংস্থানকে করেছে নিশ্চিত। আবার কারো অনেক কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও পায়নি কিছুই। মঞ্চী এই না পাবার দলে। মঞ্চীকে কিছু করে দিতে না পারার জন্য সত্যচরণের আফসোস হলেও নিরাশ্রয়া কুন্তাকে দশ বিঘা জমি দিয়েছে সে, যা ছিল তার ম্যানেজারী জীবনের একটি সৎ কাজ। বৃদ্ধ গিরিধারীলালও জমি পেয়ে খুব খুশি। মটুকনাথ তার পৈতৃক ব্যবসায় পেরেছে ফিরে যেতে। বড় কিছু না পাওয়ার দলে যারা রয়ে গেল তারা হল---গনোরী তেওয়ারী, ধ্রুবা ও তার বোন জবা । তারা সম্পত্তি চায়নি, অথচ যা জীবনের পরম চাওয়ার বিষয় সেই প্রেম থেকে হয়েছে বঞ্চিত। আর বালক ধাতুরিয়া তো হেরেই গেল জীবনে কাছে। ভানুমতীদের কিছু চাওয়া-পাওয়া থাকতে নেই, তারা দেয়–– সব সময় তারা দিয়েই এসেছে। ছেড়েছে এই বিশাল অরণ্য, এক সময় যা তাদের বিচরণ ক্ষেত্র ছিল তা এবং তাদের শ্রম, কষ্টার্জিত ভোগ্য পণ্য। বিজয়ী আর্য জাতির প্রতিনিধি সত্যচরণের চোখে ভেসে ওঠে এই দেওয়ারই আর এক ভবিষ্যৎ চিত্র– ‘‘তামার কারখানার চিমনি, ট্রলি লাইন, সারি সারি কুলি-বস্তি, ময়লা জলের ড্রেন, এঞ্জিন-ঝাড়া কয়লার ছাইয়ের স্তুপ– দোকান-ঘর, চায়ের দোকান, .... কলের বাঁশীতে তিনটার সিটি বাজিল। ভানুমতী মাথায় করিয়া এঞ্জিনের ঝাড়া কয়লা বাজারে ফিরি করিতে বাহির হইয়াছে–– ‘‘ ক-ই-লা  চা-ই-ই –– চার পয়সা ঝুড়ি।’’



গ্রন্থপঞ্জী
১.  আরণ্যক – বিভূতিভূষণ উপন্যাস সমগ্র (দ্বিতীয় খণ্ড ), তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত, ১ম শুভম, সংস্করণ, ১লা বৈশাখ, ১৪১৮; শুভম, ৭ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কল-৭৩

২. বাংলা উপন্যাসের ইতিহাস (তৃতীয় খণ্ড)–– ক্ষেত্র গুপ্ত, ১ম সংস্করণ, ১লা ডিসেম্বর, ২০০০; গ্রন্থনিলয়, ৫৯/১ পটুয়াটোলা লেন, কল-৯

৩. কালের প্রতিমা –  অরুণ কুমার মুখোপাধ্যায়, পঞ্চম সংস্করণ, এপ্রিল ২০১০; দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা-৯


  • ৪. বিভূতিভূষণ : বিচার ও বিশ্লেষণ –– পার্থজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত, ১ম প্রকাশ, জানু, ১৯৯২; পান্ডুলিপি, ১৬ শ্যামাচরণ দে স্ট্রীট; কল-৭৩

রবিবার, ৬ আগস্ট, ২০১৭

বাইপাস

বাইপাস ধরে আমরা এগোলে
নির্জন ডালে শালিখের খুনসুটি
পিচ রাস্তার মুখে স্মিত ভাব

বাইপাস ধরে আমরা এগোলে 
নাগরী ভালোবেসে হাঁটে 
তিনফুট প্রশস্ত ফুটপাথ 









সম্পৰ্ক





স্টেয়ার চেঞ্জ-এ বদলে যাচ্ছে
                সম্পর্কের পাটিগণিত

যদি তোমার এক্সট্রা x থাকে
অনায়াসে আমার y মেনে নাও

a ক্যাটেগরি তোমার কনভয়
আমি b এর মতো x = y ফর্মুলায়
                         সমান্তরাল চলি

অতএব,
ax = by সিনেমা, কফিশপ
  a = by/ x
a/b= y/x
তুমি/ আমি = সে/ ও

গিমলেট

প্রিয় রমনীবৃন্ত থেকে উঠে আসা
কস্তুরী শব্দ
ঘোড়ার জিন খুলে নেমে যাওয়া
সিপাহী

এখানে হিট বাইট নকশা
ট্রাফিকের দূরত্ব মাপা ঘড়িতে
গরমের গিমলেট গিলে খায় কবি কবি
ব্যস্ততা 

আমরা শুধু জীবনের হীন দৈনিকে বাঁচি

আপেল ঝরে গেছে- সবুজ সবুজ আপেল অনেক দিন রেস্তোরাঁ বিকেল নেই কাকাতুয়া গল্প নেই ভার্চুয়াল প্রেম ও প্রপাত = আমাদের দৈনিক মহাফেজখানায় সন্দেহ করোন...