সোমবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২২

আমরা শুধু জীবনের হীন দৈনিকে বাঁচি






আপেল ঝরে গেছে- সবুজ সবুজ আপেল
অনেক দিন রেস্তোরাঁ বিকেল নেই
কাকাতুয়া গল্প নেই

ভার্চুয়াল প্রেম ও প্রপাত = আমাদের দৈনিক

মহাফেজখানায় সন্দেহ করোনা নিয়ে
হেঁটে কিংবা চানাচুর ও মদে 
পলাতক ঘুম খেয়ে পিং পং চলে যাবো

চলে যাওয়াকে বাঁচা বলে 
লোকমুখে খসে পড়ার নাম পতন

কোয়ারেনটিন অনুভূতি নিয়ে শুয়ে থাকা-
এভাবে জানালা খোলার আগে 
আয়ুর ক্ষয় ভাবিনি কখনো

অনুলোম-বিলোম শেষে 
খিদে পায় কবিতা, ভেসে ওঠে গান
তুমিও সরস্বতী নিয়ে বসছ রোজ 
নাকি উগলে দিয়ে জন-জীবন
বহু ব্যঞ্জন, শিক কাবাবের করছ খোঁজ ?

থমকে গেছে প্রথিতযশ
হাইওয়ে খুলে দেখি রচনাধর্মী একাধিক
কত বুক নিস্তব্দ ডানা তুলে 
দিক-বেদিক উড়ে যাচ্ছ পাখি

প্রতিদিন ঝড় ওঠে ও নামে
লেখা হয় অসংখ্য বজ্রপাত
চায়ের দোকানে, মুটে-শ্রমিকের ঘরে

আমরা শুধু জীবনের হীন দৈনিকে বাঁচি-
ভার্চুয়াল প্রেম ও প্রপাতে

বৃহস্পতিবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২২

অবসাদ



মনোজিৎ দাস


কুচকাওয়াজ শেষে সবই নিথর- 
লেফট-রাইট একটা নাম জীবনের

সাদা দিস্তাকে অঙ্ক খাতা বলে ভুল করা

অ্যানড্রয়েড স্ক্রিনে চির ধরা আয়ুর ক্ষয়
ভুলে যাওয়া এক একটি কবিতার 
                     কিওকারপিন সন্ধ্যা 

নদীও একদিন শান্ত হয়

 ফাস্টফুড শেষে ফিরে আসে 
               ১২৮ জিবি অবসাদ
                                  -

রবিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২২

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্পে দাম্পত্য সমস্যা 

মনোজিৎ দাস 

                                                             

                                           



সুচিত্রা ভট্টাচার্যের জন্মস্থান ভাগলপুর এবং পৈত্রিক নিবাস মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহর হলেও কলকাতায় কাটে তাঁর শিক্ষা এবং কর্ম জীবন । ফলতঃ তার গল্পে বরাবরই উঠে এসেছে শহর কলকাতার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ ও পরিবারের কথা । তিনি তাঁর 'পঞ্চাশটি প্রিয় গল্প'র ভূমিকায় লিখেছেন- "কখনও শুধু একটা মুহূর্ত নিয়ে গল্প এসেছে মাথায়, কখনও কোনও ঘটনা হয়ে গেছে বিষয়, আবার কখনও বা গল্পকে বাঁধতে চেয়েছি আর একটু বৃহৎ প্রেক্ষিতে । তবে কলম মোটামুটি ঘুরপাক খায় আমার চেনাজানা দুনিয়ার বৃত্তেই ।" গত শতকের সাত-এর দশকের শেষ থেকে বর্তমান শতকের প্রথম দশক অবধি তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য ছোট গল্প । কোনো তত্ত্ব বা জটিল কোনো জীবন জিজ্ঞাসা নয়, তিনি যে গল্প বয়ন করেন সেখানে উঠে আসে শহুরে মধ্যবিত্ত জীবনের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষা, সন্তানের প্রতি স্নেহ-মমতা, তাদের শিক্ষা ও সফল কেরিয়ার গড়ার স্বপ্ন, ভুল বোঝাবুঝি থেকে দাম্পত্যের বিচ্ছেদ, মূল্যবোধের অবনতি ইত্যাদি নানা বিচিত্র বিষয় । তবে দাম্পত্য সমস্যা তাঁর গল্পে একটা আলাদা জায়গা করে নেয় ।  

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্পে দাম্পত্য সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের পরিচিত নাগরিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত চাকুরিজীবীর আত্মসর্বস্বতা, নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতি পুরুষের পৌরুষতন্ত্র কায়েম করতে না পারার ব্যর্থতা বা কখনো অন্য নারীর প্রতি পুরুষের আসক্তি । বিবাহিত পুরুষ বা নারী তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে অধিক মাত্রায় লাগামছাড়া করতে গিয়ে এই ভাঙ্গনকে করেছে ত্বরান্বিত । তবে, একটা চাপা যন্ত্রনা থাকলেও এই দাম্পত্যের গল্পগুলোতে নারী বা পুরুষের তেমন কোনো ভয়াল রূপ আমরা দেখতে পাই না । মিউচুয়ালভাবেই তারা তাদের এই বিচ্ছেদকে মেনে নেয় । আলোচ্য প্রবন্ধের সংক্ষিপ্ত পরিসরে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের গল্পের দাম্পত্যের এই সমস্যার দিকটিকে আমরা দেখানোর চেষ্টা করব ।

রুমি ও কৌশিকের সম্পর্কের ভাঙনে চিন্তিত ঠাকুরমা বিজয়ার দাম্পত্যের স্মৃতিচারণায় প্রজন্মগত ব্যবধানের দিকটিকে সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন সুচিত্রা ভট্টাচার্য তাঁর 'এখন হৃদয়' গল্পটিতে । ঘরকন্যা গোছানোর জন্য যেখানে এক বছর সময় যথেষ্ট নয়, রুমি আর কৌশিকের দাম্পত্যের স্থায়িত্ব সেখানে মাত্র কয়েক মাস । বিয়ের পর রুমি এক টেলিভিশন চ্যানেলে কাজ পায় । জার্নালিস্ট, ফ্রিল্যান্সার কৌশিক রুমির এই কাজকে সন্দেহের চোখে দেখে । বিবাহপূর্ব প্রণয় থেকে উত্তীর্ণ তাদের দাম্পত্য সম্পর্কে চির ধরে । রুমি বাবার বাড়ি ফিরে আসে । দুজনে মিউচুয়াল সেপারেশনের জন্য উকিলের সাথে পরামর্শ করে । রুমি তার ঠাকুরমা বিজয়ার প্রশ্নের জবাবে বলে-" পোষাচ্ছেনা, থাকব না একসঙ্গে, তা বলে আমরা তো কেউ কারুর শত্রু নই ! .... কাদা ছোঁড়াছুঁড়িই বা কেন করতে যাব ! এখনকার প্রজন্ম যে কত সহজেই একটি সম্পর্ক ভেঙে ফেলে অথচ বুকে ভালোবাসা লুকিয়ে রেখে গোপনে অশ্রুপাত করে তারই গল্প 'এখন হৃদয়' । 

'সামনে সমুদ্র' গল্পে দেখি, ঘরে স্ত্রী-পুত্র রেখে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের মাঝারি অফিসার ধীমান ভালোবাসে দোলন নামের বছর চব্বিশ-পঁচিশের এক সুন্দরী মেয়েকে । দোলন যেত ধীমানদের অফিস ফ্লোরের এল আই সি-র ব্রাঞ্চে তার বাবার অ্যাক্সিডেন্ট ক্লেম নিয়ে । প্রতিদিন ব্যর্থ মনে ফিরে যাওয়া দোলনের অশ্রুবিন্দু ধীমানের 'ভ্যাদভ্যাদে' জীবনের পালে হঠাৎ গতি এনে দেয় । তারপর সম্পর্ক বহুদূর গড়ায় । কলকাতার দম বন্ধ হওয়া পরিবেশে হাঁপিয়ে ওঠে দোলন । এদিকে স্ত্রীর কাছ থেকে বাসনাগুলো পূর্ণ না হওয়া এবং অফিস- বাড়ি করে ধীমানের জীবনও যে বিস্বাদ হয়ে উঠছিল ! চাঁদিপুর বেড়াতে গিয়ে দুজনেই আবার নতুন করে ফিরে পায় জীবনের স্বাদ । সমুদ্র তাদের কাছে হয়ে যায় নেশার মতো । পারস্পরিক চাহিদা গুলোকে তারা উপেক্ষা করতে পারে না । অসাবধানী ধীমান ধরা পড়ে যায় তার স্ত্রীর কাছে । শ্রাবণী বিষয়টি গোপন রাখে । পুত্র তাতারের গরমের ছুটিতে সমুদ্রে বেড়াতে গিয়ে তারা ওঠে চাঁদিপুরের ক্যাসুরিনা হলিডে রিসর্টে- যেখানে  ধীমান কত রাত গুনেছে দোলনের পিঠের লাল তিল, প্রত্যক্ষ করেছে দোলনের উরুর কালচে বাদামী জড়ুল । ধীমানের ফরমায়েশ খাটতে আর ছেলের পড়াশুনো নিয়ে ব্যস্ত থাকতে গিয়ে যে শ্রাবণী বেরঙীন থেকেছে, যাকে দেখে এতদিন নিরুত্তাপ মনে হয়েছে ধীমানের, আজ বিচে- "দূর থেকে মনে হয় ও যেন শ্রাবণী নয়, অন্য কোনও নারী, যাকে ধীমান চেনে না, আগে কখনও দেখেনি ভাল করে ।" ভিতর সমুদ্রে শ্রাবণীর অতলতা স্পর্শ করতে চায় ধীমান ।  ধীমানের একটা পরীক্ষা হয়ে যায় সেখানে । পরাজিত ধীমানের কাছে সমুদ্রকে মনে হল বড় নির্মম । রাতে শ্রাবণী ধীমানকে জানলো-" তোমার সঙ্গে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয় ।" দাম্পত্য বিচ্ছেদের এই নিঃশব্দ উচ্চারণ শোনার জন্য ধীমান যে তৈরি ছিল না তা বলাই বাহুল্য । 

ডাউন ট্রেনের যাত্রী নন্দিতার সাথে কামরায় দেখা হয় প্রাক্তন স্বামী অরুণের স্ত্রী রাকা রায়ের সাথে । কথায় কথায় নন্দিতা রাকার কাছ থেকে জেনে নেয় অরুণের স্বভাব-চরিত্র, রাকা রায়ের পছন্দ-অপছন্দের নানা খুঁটিনাটি বিষয় । পুরোনো স্মৃতিগুলি হাতড়ে বের করে আনে নন্দিতা ।  বিচার করতে বসে অরুণের উচ্ছল, একরোখা রোমান্টিক, নিষ্ঠুর স্বভাবের পাশে বর্তমান অধ্যাপক স্বামী শ্যামলেন্দুর নির্লিপ্ততাকে । কিন্তু "শ্যামলেন্দুই বা কম নিষ্ঠুর কীসে !" আর এখানেই বুঝি নারীর চোখে ভেসে ওঠে সমস্ত পুরুষের এক চিত্র। বলতে দ্বিধা নেই যে সুচিত্রা ভট্টাচার্য তাঁর অধিকাংশ গল্পের মধ্যেই নারীর চোখে দেখা পুরুষের এই বিশেষ দিকটিকে একটা আলাদা প্রাধান্য দিয়েছেন । 'উজান' নামের এই গল্পটি আলোচনা প্রসঙ্গে আমাদের মনে আসে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় পরিচালিত 'প্রাক্তন' সিনেমাটির কথা । ২০১৬ সালে মুক্তি প্রাপ্ত এই ছবিটিতে একই কাহিনীর পরিবর্তিত রূপ দেখি । গল্পের নামের অনুকরণে সিনেমার নায়কের নাম রাখা হয় উজান ।

 দম্পতির বনিবনা না হওয়ার এইরকম আরেকটি গল্প 'ফিফটি ফিফটি' । গল্পটিতে সুচিত্রা ভট্টাচার্য আমাদের দেখিয়েছেন দুই বন্ধুর সমান্তরাল দাম্পত্য চিত্র । একদিকে আছে রাতুল আর ঈশিতার সুখী দাম্পত্য, অন্য দিকে নব বিবাহিত অয়ন এবং সোমঋতার প্রতিদিনের কনট্রাডিকশন । অয়ন আর সোমঋতা পাঁচ বছর সাত মাস ফিফটি ফিফটি কন্ট্রিবিউটের পর চার হাত এক করে । কিন্তু কয়েক মাস যেতে না যেতেই অয়নের মনে হয়, তার ব্যক্তি স্বাধীনতায় আঘাত করছে সোমঋতা । সে টর্চার্ড হচ্ছে সোমঋতার কাছে । অন্যদিকে সোমঋতাও অয়নের ব্যবহারে ক্রমশ বিষিয়ে উঠছিল । শুতে, বসতে সব ক্ষেত্রেই তাদের মিসম্যাচগুলি এক বছরের মধ্যে ডেকে আনল বিচ্ছেদ । অয়ন চাকরির ট্রান্সফার নিয়ে চলে গেল হায়দরাবাদ । সোমঋতা একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে রয়ে গেল কলকাতায় । ব্যাচেলর লাইফ থেকে ফিফটি ফিফটি শেয়ারে বিশ্বাসী অয়ন শেষ পর্যন্ত এই পন্থাকেই বেছে নিল যে তারা এক ছাদের তলায় থাকবে না । তারা এখন মাঝেমধ্যে হায়দরাবাদ আর কলকাতার মাঝামাঝি কোনো জায়গায় মিট করে  ।  দূরে থাকলে ভালোবাসা গাঢ় হয় উপরন্তু সেখানে থাকে না প্রতিদিনের একঘেয়ামিতা তা বেশ সুন্দর ভাবে দুই বন্ধুর দাম্পত্য চিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন সুচিত্রা  ভট্টাচার্য । 

ইগো, পারস্পরিক বিশ্বাসহীনতা, সহযোগিতার অভাব থেকে দাম্পত্য বিচ্ছেদের গল্প 'সম্পর্ক' । রজত ও ইন্দ্রাণী দুজনেই চাকুরিজীবী । একজন প্রাইভেট, আরেকজন সরকারি । ইন্দ্রাণী খুব আত্ম অভিমানী । অন্যদিকে রজতের মধ্যে মেল ইগো একটু বেশি মাত্রায় ক্রিয়াশীল । স্ত্রীর চাকরি এবং তার চাকরিসূত্রে পাওয়া ফ্ল্যাটে থাকা রজত মেনে নিতে পারে না । এই মেনে না নেওয়া থেকেই তাদের দাম্পত্যের অশান্তির সূত্রপাত । পারস্পরিক সন্দেহপ্রবণ মন এই অশান্তিকে আরও জটিল করে তোলে । বিচ্ছেদর পাঁচ বছর পর কন্যার অসুস্থতার কারণে একদিন রজত যায় ইন্দ্রাণীর ফ্ল্যাটে । ডিনার টেবিলে তারা পরস্পর মুখোমুখি হয় এবং দুজনেই  দুজনের দোষ-ত্রুটিগুলিকে তুলে ধরে । 

 অন্য আরেকটি জটিল দাম্পত্যের গল্প 'বাজি'। এই গল্পে বসুন্ধরা আমাদের শুনিয়েছে তার চার দশকের দাম্পত্যের কথা । সম্পূর্ণ অমত সত্তেও 'দোকানদার' চেহারার অল্প শিক্ষিত এক কেজো পুরুষের সঙ্গে বিয়ে হয় সাহিত্য- সংস্কৃতিপ্রিয়, উচ্চ শিক্ষিতা রুচিমতি বসুন্ধরার । বিয়ের পর ফুলশয্যার রাতে দিবানাথের বাড়ির নহবতখানায় মালকোষ রাগে সানাই বাজছিল । রাগ সম্পর্কে অজ্ঞ দিবানাথ মালকোষকে দরবারি কানাড়া বলে চালিয়ে দিতে চাইলে বসুন্ধরা ছোটবেলার অভ্যাস বশতঃ বাজি ধরে এবং জিতে যায় । তার পর থেকে স্বামীর সঙ্গে বাজি ধরার নেশা তাকে পেয়ে বসে এবং প্রতিটি বাজিতেই জিততে থাকে সে । পূর্বাশা পত্রিকায় লেখা ছাপিয়ে সে স্বামীর কাছ থেকে যেমন লিখতে বাঁধা না পাওয়ার প্রতিশ্রুতি আদায় করে নেয়, তেমনি পুত্রসন্তান হওয়ার পক্ষে বাজি ধরে আদায় করে নেয় দিবানাথের আর কোনো সন্তান না চাওয়ার প্রতিশ্রুতি । এই ভাবে শেষ বাজিতেও স্বামীর আগে মরে জিততে চায় বসুন্ধরা । দিবানাথ চিৎকার করে বলে ওঠে- "একবারও কি তুমি হারবে না জীবনে ?" একটি বার জিতে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছে নিয়ে এক ভোর বেলায় নিরুদ্দেশ হয়ে যায় দিবানাথ । বারংবার জিতে গিয়েও এক নারীর হেরে যাওয়ার গল্প 'বাজি' । শেষ  বাজিতেও হয়তো বসুন্ধরা জিতে যেতে পারত যদি না দিবানাথ নিরুদ্দেশ হত । তবে বসুন্ধরার এই জিতে যাওয়ার ব্যাপারটি ছিল রাজ্য লটারিতে প্রথম পুরস্কার পাওয়ার মতোই ব্যাপার যা বাহ্যিক সমৃদ্ধি এনে দিতে পারলেও মনের প্রকৃত সুখ এনে দিতে অক্ষম । সেই রাতেই তো বসুন্ধরা হেরে গিয়েছিল যখন সে তার অপছন্দের পাত্রকে বিয়ে করেছে ।

আরেকটি গল্প 'শিখার ঠিকানা' । পিতা মাতার বিচ্ছেদের ফলে সন্তানের অসহায়তার দিকটিকে এখানে তুলে ধরেছেন লেখিকা । গল্পটিতে আমরা দেখি শিখা তার আগের সংসারের আট বছরের সন্তান মান্তুর জন্মদিনের উপহার নিয়ে যায়  দেবাশিসের  বাড়িতে । কিন্তু প্রচন্ড অভিমান নিয়ে  মান্তু তা প্রত্যাখ্যান করে । দেবাশিসের কাছে অত্যাচারিত শিখা একান্ত বাধ্য হয়েই একদিন বাপের বাড়ি চলে গিয়েছিল । কিন্তু দাদা-বৌদির সংসারে যে তার কোনো আশ্রয় নেই তা জানতে পেরে শিখা সমস্ত পিছুটান ঝেড়ে ফেলে অনিন্দ্যকে বিয়ে করে । তবু স্নেহের কাছে পরাজিত শিখা বার বার ফিরে যায় মান্তুর কাছে দেবাশিসের বাড়ি । মুখে না বললেও অনিন্দ্য শিখার এই স্নেহকে মেনে নিতে পারে না । চৈত্রের ঝড়ে শিখা দু হাতে মুখ ঢেকে  অনুভব করে তার ঠিকানাহীনতা- "সত্যিকারের ঠিকানা কি থাকে কারুর ! কোথাও ! কোনখানে ! কে জানে !"  কিন্তু ঝড়ের সামনে পড়লে পিছনে হেঁটে যাওয়াটাই বোধ হয় প্রকৃত বুদ্ধিমানের কাজ । আর "এভাবেই পিছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে যেখানে পৌঁছনো যায়, সেটাই একমাত্র প্রকৃত ঠিকানা ! যে ঠিকানা হারায় না কখনও !" তবু সংসার সাগরে উদ্ভ্রান্ত শিখা হাঁটতে থাকে । 

সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কিছু কিছু গল্পে আমরা পাই সুখী দাম্পত্যের চিত্র । এমন একটি গল্প 'আরও ছ'ইঞ্চি' । গল্পটিতে আমরা দেখি পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অদম্য ইচ্ছা শক্তির জোরে দীপক আজ কারখানার মালিক । একটা দশ লক্ষ টাকার নিজস্ব ফ্ল্যাট হয়েছে তাদের । অথচ, বছরের পর বছর তারা একসঙ্গে জীবনের অনেকগুলো সময় কাটিয়ে এসেছে ভাড়া বাড়িতে । দুটো পয়সা আয়ের জন্য চিত্রলেখা একসময় করেছে গানের টিউশ্যনি । দেড়শ টাকার মাইনের কাজের জন্য ছুটেছে দীপক । আজ কামিনী ফুলের সুবাস মাখা ঘর, আই আই টি থেকে পাস করা সাকসেসফুল ছেলে নিয়ে তারা খুব সুখী । মানুষের চাওয়ার আকাঙ্ক্ষার যে কোনো প্রান্তসীমা থাকে না তার একটা চিত্র গল্পটির মধ্যে আছে । তবে এই পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বুঁদ থাকতে গিয়ে মানুষ যে ফিলিংলেস হয়ে পড়ে, অবসরের চর্চাগুলো হারিয়ে ফেলে তার সূক্ষ্ণ ইঙ্গিত আমরা পাই খাটের তলায় ধুলোমাখা একটা সেতার আর হারমোনিয়াম পড়ে থাকতে দেখে ।

গ্রাম জীবনের পটভূমিকায় সুচিত্রা ভট্টাচার্যের শ্রেষ্ঠ দাম্পত্য জীবনের গল্প 'বাদামী জড়ুল' । অভাবে, দুঃখে-সুখে, ভালোবাসায় কোনোরকমে কেটে যাচ্ছিল লখীন্দর ও চাঁপির সংসার । একসময় গায়ক সনাতন এসে গান শুনিয়ে ভুলিয়ে দেয় চাঁপির মন । তারা দুজনে পালিয়ে গিয়ে অন্য জায়গায় ঘর বাঁধে । জন্ম দেয় পুত্র সন্তানের । প্রায় সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে লখীন্দরের চোখে চাঁপির মুখটা ঝাপসা হয়ে গেলেও ''স্পষ্ট শুধু চাঁপির দু বুকের মাঝে সেই বাদামী জড়ুলখানা । "কিন্তু যে বউটা "পিরীত করে পালিয়েছে নাঙ এর ঘর করতে" তাকে ভুলে গিয়ে কুসিকে বিয়ে করতে বলে বৃন্দাবন । এদিকে বিপুল সম্পত্তির মালিক হওয়ার স্বাভাবিক লোভ এবং কুচ্ছিৎ কুসিকে গ্রহণ করতে না পারার মানসিক টানাপোড়েনে লখীন্দর যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় তখন কোলের সন্তান নিয়ে ফিরে আসে চাঁপি- কারণ সনাতনের "খেতি দিবার মুরোদ নেই, পিরীতির গোঁসাই ।" পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ প্রেমে, কিন্তু সেই প্রেমও যে খিদের কাছে তুচ্ছ তা চাঁপির ফিরে আসাতেই স্পষ্ট । 

সুচিত্রা ভট্টাচার্য এমন একজন লেখিকা যিনি নারীবাদের একপেশে লেখনীকে বর্জন করে আমাদের সমাজ ও পরিবারের বাস্তব চিত্রগুলি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন । বিংশ শতাব্দীতে সারা বিশ্বব্যাপী ফেমিনিজমের যে ঢেউ, তা থেকে তিনি একটু তফাতে থেকে লিবারাল নারীবাদীর ভূমিকা পালন করেছেন । আর এই কারণেই বোধ হয় তার পাঠক সংখ্যা ঈর্ষণীয়ভাবে অন্যান্য নারীবাদী শিল্পীর তুলনায় একটু বেশি । তবে দাম্পত্যের খুঁটিনাটি বিষয়গুলিকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে উপস্থাপন করতে গিয়ে তাঁর নারী মন সংসারের খাঁচায় বদ্ধ অবহেলিত নারীদের প্রতি  যে বেদনাবিধুর হয় না, তা নয় । এই বেদনা থেকেই তিনি তাই কল্পনা করতে পারেন নারীতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার । 'নারীতান্ত্রিক' গল্পে দেখি, বিমান সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীর জন্য চা করে, অফিসের টিফিন করে দেয়, কন্যাকে স্কুলের জন্য তৈরি করে । ঘর দুয়োর সাজিয়ে রাখে । স্ত্রীর কাপড় কেঁচে দেয় । সন্ধ্যের সময় মেয়েকে পড়াতে বসায়, স্ত্রীর পছন্দমতো রাতের রান্না করে । গালি খায় । পাশের ফ্লাটের সুব্রত, রঞ্জিত সকলেরই একই অবস্থা । নারীতান্ত্রিক সমাজ । কিন্তু নারীরা তাদের ব্যক্তি স্বাধীনতাগুলি অধিকমাত্রায় উপভোগ করতে গিয়ে যে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার চেয়েও নির্মম হয়ে ওঠে তা দেখাতে ভোলেন না সুচিত্রা ভট্টাচার্য । নারী ও পুরুষ একই মুদ্রার দুই পিঠ, একই রক্ত-মাংসে গড়া মানুষ, যারা শুধু লিঙ্গগত ব্যবধানে আলাদা- এই ধারণাটিকে মাথায় রেখে তিনি যে সাহিত্য রচনা করতে এসেছেন তা তাঁর সাহিত্য পাঠে আমরা অনুভব করতে পারি ।


উল্লেখঃ 

প্রবন্ধে উল্লেখিত সমস্ত উদ্ধৃতি গ্রহণ করা হয়েছে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের 'পঞ্চাশটি প্রিয় গল্প'র ১ম সংস্করণ, ১২তম মুদ্রণ, নভেম্বর,২০১৪ থেকে । প্রকাশক- শ্রীনির্মলকুমার সাহা, সাহিত্যম্ , শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কল- ৭৩ 



লেখক পরিচিতি : সহকারী শিক্ষক । 






মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২০

                   



বাড়ি ফিরছে ওরা 
                       
















ওই দেখো পিঁপড়ের সারি- পরিযায়ী
কারা যেন দিয়েছে এই নাম 
দিনরাত হেঁটেও ক্লান্তি নেই তাদের অথচ, 
একটু অবসরে পাশে বসলেই এটা ওটা করার ছলে 
                                                   উঠে যাও তুমি

জানি, তোমারও ভালো লাগে না এসব খুনসুটি

জানালায় চেয়ে থাকো- পাখিদের দেখো- মিল খোঁজো 

অসহ্য আকাশ- বৃষ্টি তো হচ্ছে প্রতিদিন, তবু 

ডালিম রসের মতো তৃপ্তি কই- সুখ নেই চিবিয়ে চিবিয়ে 

বাড়ি ফিরছে ওরা-

নরম বুকে বারান্দায় জেগে আছে মা 
দুঃশ্চিন্তায় বিড়ির তাড়া শেষ করে ক্লান্ত বাবা

ওরা বাড়ি ফিরছে- 

ভারতবর্ষ এভাবে কোনোদিন তাদের ফিরতে দেখেনি
সাতচল্লিশে না- তার আগেও নয়

মরতে মরতে বাড়ি ফিরছে ওরা


                   

                                      ছবি- গুগোল

বৃহস্পতিবার, ২৪ মে, ২০১৮

আনস্পেক্টেড ম্যানার থেকে শিরোনাম বহির্ভূত


আনস্পেক্টড ম‍্যানার থেকে শিরোনাম বহির্ভূত
 -মনোজিৎ দাস


চপ্পল ছিঁড়ে গেলে যে ভাবে হাঁটা হয় কিংবা
ইলেক্ট্রিক না আসা অবধি ওয়েটিং ...
জানালার ফাঁকে দেখা লুম্পেন সকালের মাঠ
ছ্যাদা বাগানের পাশে ফ্যাক্টরির ধোঁয়া
চুইয়ে পড়া এইসব লিমেরিক দেখে কেটে যাচ্ছে
                                        বিকেল এবং নিরাময় রাত।

ডিপোজিট ভেঙে দাও

অ্যামাজিং স্বপ্নের কারিকুলা পুরোনো বাক্সে রেখে বাই বাই হয়ে যাও

এখন কবিতা লেকের সময় 
এখন লিখতে চাই চায়ের বিকেল
মদ আর চায়ের সাইকেল- এ কন্টিনিউয়াস ফ্লো অফ দি পাগলামি
                        তারপর
                          চিড়িয়া ধরার গান।

নুনুকে পাখি বলা শৈশব
যন্ত্রণার স্কুল
না খেলতে পাওয়া বিকেল
সন্ধ্যার বৈতাল লেখা
অঙ্কের ভুল
বড়ি খোরের মতো ক্লান্তির ঘুম-
স্বপ্ন ভাঙ্গন

একা অসমাপ্ত বোঝাপড়া থেকে একটা আনস্পেক্টেড ম্যানার নিয়ে
লিখে যেতে দাও।


বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১৮




রাজকুমার এবং আমি


তিন দিন হয়ে গেছে রাজকুমার বাবুর জন্য একটি কবিতা লিখতে পারিনি 

রাজকুমার বাবুর মৃত্যুর আগে,
নির্লজ্জ সন্ধ্যায় পালিয়ে আসার আগে,
অপেক্ষারত ডিম ভাত খেয়েছিলাম ।

আমি পেরেছি । ভাত খেয়ে সিগারেট টেনেছি । 
ওদের মুখে ধোঁয়া ছেড়ে এসেছি ।
রাজকুমার পারেনি ।

কালো রক্তের আমি, আমার মাথার কোনো
দাম নেই বলে পালিয়ে এসেছিলাম । 



রাজকুমার জিতে গেছে । রাজার মতো
মরেও জিতে গেছে ।
রাজার কুমার । 

শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭


কনটেম্পোরারি


ভালোবাসা ঋণ পেলে 
অ্যাপ্লাই করা যেত স্মার্টফোন

ইউনিক রঙের ওই চোখ
সরল বর্গীয় ভরসার হাত 

কাছে এলে প্রিয় রঙ
খুলে যেত পায়রার সরোবর 
               লেমনেড বিকেল 

তুলে নিলে ট্যাক্সির ব্যস্ততা
ইনভেস্ট করা যেত প্রাইভেট রুলস
ফিলাপ করা যেত ই. এম.আই. ফর্ম 
 ঋণে পেলে ভালোবাসা 
               ----







আমরা শুধু জীবনের হীন দৈনিকে বাঁচি

আপেল ঝরে গেছে- সবুজ সবুজ আপেল অনেক দিন রেস্তোরাঁ বিকেল নেই কাকাতুয়া গল্প নেই ভার্চুয়াল প্রেম ও প্রপাত = আমাদের দৈনিক মহাফেজখানায় সন্দেহ করোন...